f
TAGS
H

Chandrabindoo

Manisankar Biswas

বাংলা বা বাঙ্গালীর  ইতিহাস বলতে অধুনা বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামের বরাক উপত্যকার বিগত চার সহস্রাব্দের ইতিহাসকে বোঝায়। যদিও এখন যাকে আমরা মিথিলা বলে জানি, একসময় ওই অঞ্চলে যাঁরা বসবাস করতেন সেই মানুষজন থেকে আজকের মায়ানমারের রেঙ্গুন অবধি বাঙালি জনজাতির বসবাস ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তারও আগে এই বাঙালিজাতির বসতি, আরও উত্তর বা উত্তর পশ্চিম বা পশ্চিম ভারতে ছিল কি না তা আমার জানা নেই। এই বিষয়টা অনুসন্ধানযোগ্য। তবে খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক (কম বেশি) ২৫০০ বছর থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০ বছর পর্যন্ত অধুনা বিহারের মিথিলা থেকে মায়ানমারের রেঙ্গুন পর্যন্ত ছিল। এর পরবর্তী ইতিহাসটা বিতর্কিত ও তর্ক-সাপেক্ষ। তবু এটা অনুমান করা যেতেই পারে যে আর্যদের হাতে মার খেয়েই জাতিটা এই অঞ্চলের বাসিন্দা হয়ে উঠেছিল। এখন অবশ্য আরও পশ্চাৎপদ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আবার সারা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এই জাতিটি। কিন্তু স্বভূমিতেই এই জনজাতির অস্তিত্ব আজ মহা সঙ্কটে। এই সংকটময় অবস্থাতেও এই জনজাতির উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্য ভাষা, অন্য সংস্কৃতির প্রভাব। কোথাও কোথাও আবার বলপূর্বক ভিন্ন ভাষা শেখার ও বলার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। জাতিটির গায়ের শক্তি প্রবল নয় কিন্তু মস্তিষ্ক বড়ই তীক্ষ্ণ। বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হলেও পেশী শক্তি না থাকাটা বাঙালিদের সব চেয়ে বড় অন্তরায়। যার জন্য এই জাতিকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয় বা হয়েছে। ধর্মীয় বিভেদ সহ্য করতে হয়েছে সুলতানি আমলের সময় থেকেই। এমন কি দেশ ও মাটি ভাগ পর্যন্ত সহ্য করতে হয়েছে। তবু এই জাতিটা আজও টিকে আছে। ভাষাকে প্রাণের মাঝে আঁকড়ে ধরে টিকে আছে। আজ যে এই জাতিটির অস্তিত্ব সংকটপূর্ণ একটি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, তার জন্য শুধু ধর্মীয় মৌলবাদ নয়, ধর্মীয় মৌলবাদের রাজনীতিই দায়ী। এক শ্রেণীর ধর্মীয় মৌলবাদ বলছে, বাঙ্গালীর আপন সংস্কৃতির মূল ভিত্তি সনাতন হিন্দুধর্মে নিহিত, অর্থাৎ বাঙ্গালীর সাজসজ্জা, আচার, আচরণ। সুতরাং এই সবই বর্জনীয়। বরং বিজাতীয় আরবি ফার্সি ইত্যাদি সংস্কৃতির বহিরঙ্গকে আপন করে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে গোবলয়ের ধর্মীয় রাজনীতি এই জাতিটিকে দিয়ে রামনবমী, ধনতেরাস ‘মানান’ থেকে শুরু করে হনুমান চালিশা পড়িয়ে নিতে চাইছে। এরা চাইছে বাঙ্গালী ভেজ-বিরিয়ানি খেতে শিখুক। এই সবই আগ্রাসন। কেউ বোকা না হলে এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সামনে মাথা নিচু করবেন না। 

অন্যদিকে যদি আমরা বাংলা নববর্ষের ইতিহাসটা একটু দেখি, দেখব এটির ইতিহাসেও বাঙ্গালীর দু’টি প্রধান ধর্মের মেলবন্ধন। হিন্দু সৌরপঞ্জি অনুসারে, বাংলায় বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই পালন হয়ে আসছে। কিন্তু গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় দেখা যায়, এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় এই সৌর বছর গণনা শুরু হত। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ভারত বর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য শুরুর পর থেকে আরবি বছর হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী তারা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরী সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সাথে এর কোন মিল পাওয়া যেত না। আর তখনই সম্রাট আকবর এর সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বাংলায় বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সম্রাট আকবরের নির্দেশ অনুসারে সে সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী বাংলা সৌর বর্ষ ও আরবি হিজরী সালের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরির কাজ শুরু করেন। বাংলা বছর নির্ধারণ নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ই মার্চ বা ১১ ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে পরীক্ষামূলক এই গণনা পদ্ধতিকে কার্যকর ধরা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর তারিখ থেকে অর্থাৎ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের তারিখ থেকে। প্রথমে, ফসলি সন বলা হলেও পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
তাই সকলের কাছে আমার তরফ থেকে একটা বিনীত অনুরোধ, আসুন আমরা সকলে মিলে ১লা বৈশাখ বা নববর্ষ – এই দিনটাকে আনন্দ সহকারে পালন করি। পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ বাঙালির। এই দিনটি কোন ধর্মের নয়, কোন জাতির নয়, নয় কোন বর্ণের। আসুন আমারা যারা বাঙালি তাঁরা সকলে যে যার মতো করে গানে, কবিতায়, সুরে, ছন্দে, পোষাকে, খাওয়া-দাওয়ায়, দিনটিকে প্রবলভাবে আনন্দ সহকারে উদযাপন  করি। আমরা অর্থাৎ সমগ্র বাঙালি জাতি ভুলে যাক তার ধর্ম, তার বর্ণ। শুধু ভাষাকে আত্মায় লালন করে আমরা যেন সোচ্চারে বলি বাংলা আমার ধর্ম বর্ণ জাতি। বাংলা আমার ভাষা। আমরা সমস্ত বাঙালী এক আত্মা এক প্রাণ। আসুন আমরা কাঁটাতার ভুলে গিয়ে, ধর্ম ভেদ ভুলে গিয়ে, এই দিনটিকে বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ দিন হিসাবে পালনে মেতে উঠি। বিশ্ববাসী জানুক বাঙ্গালী এক আত্মা, এক প্রাণ। চৈত্রের শেষ লগ্নে আগামী পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানাই সকলকে। আগামী বছর সকলের ভালো কাটুক, এই কামনা করি। শুভ নববর্ষ।



 

This product has been added to your cart

CHECKOUT